নিজস্ব প্রতিবেদক,কেরানীগঞ্জ: ৫ই আগস্টের ছাত্র-জনতার মহাবিপ্লবের পর দেশের প্রতিটি সেক্টরে যখন সংস্কারের জোয়ার বইছে, তখনো পুরনো দুর্নীতির বিষবৃক্ষ ডালপালা মেলে আছে ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রেশন বিভাগে। এর অন্যতম উদাহরণ কেরানীগঞ্জ মডেল সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, যা এখন স্থানীয়দের কাছে ‘পার্সেন্টেজ প্যালেস’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।
এই অফিসের অঘোষিত সম্রাট সাব-রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ মিরাজউদ্দিন হলেও তার রাজত্ব চলে মূলত দুই ‘সেনাপতি’—মোহরার আলম এবং নকল নবিশ কাম ক্যাশিয়ার খলিলের সিগন্যালে। এই দ্বৈত সিন্ডিকেটের সবুজ সংকেত না মিললে সাব-রেজিস্ট্রার মিরাজউদ্দিনের কলম দলিলে সই করতে রাজি হয় না বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঢাকার প্রবেশদ্বার কেরানীগঞ্জে প্রতিদিন ২০০ থেকে ২৫০টি দলিল রেজিস্ট্রি হয়। এখানে জমি কেনাবেচা করতে আসা সাধারণ মানুষ পা রাখলেই শুরু হয় সিন্ডিকেটের ‘শকুনি দৃষ্টি’। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাব-রেজিস্ট্রার মিরাজউদ্দিন সরাসরি টাকা স্পর্শ না করলেও তার হয়ে মাঠপর্যায়ে ‘কালেকশন’ ও ‘ডিল’ চূড়ান্ত করেন মোহরার আলম এবং ক্যাশিয়ার খলিল। তাদের মাধ্যমে প্রতিটি দলিলের বিপরীতে জমির মোট মূল্যের ওপর ১ শতাংশ টাকা ‘অফিস খরচ’ হিসেবে আদায় করা বাধ্যতামূলক। এই ১ শতাংশের ভাগাভাগি এমনভাবে সুবিন্যস্ত যে, এর একটি বড় অংশ সরাসরি সাব-রেজিস্ট্রারের পকেটে যায়, আর বাকিটা আলম ও খলিলের হাত ঘুরে পৌঁছায় স্থানীয় প্রভাবশালী মহলে।
ঘুষের ‘অভিনব’ ডিজিটাল সিগন্যাল:ভুক্তভোগী ও দলিল লেখকদের দাবি, দলিলে বিন্দুমাত্র ত্রুটি বা তথ্যের সামান্য অমিল পাওয়া গেলে খলিল ও আলম সিন্ডিকেট ঘুষের অংক কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। টাকা না দিলে মাসের পর মাস দলিল আটকে রাখা হয়, আর টাকা দিলেই ‘সবুজ সংকেত’ পৌঁছে যায় সাব-রেজিস্ট্রারের টেবিলে। ক্যাশিয়ার খলিলের কাউন্টার থেকে ক্লিয়ারেন্স না আসা পর্যন্ত মিরাজউদ্দিনের কলম সচল হয় না। এমনকি সরকারি ফি জমা দেওয়ার ভুয়া পে-অর্ডার বা চেক জমা দিলেও খলিলের মাধ্যমে তা অনায়াসেই পার হয়ে যাচ্ছে, যা সরাসরি সরকারি রাজস্বে বড় ধরনের ধস নামাচ্ছে।
রাজস্ব ফাঁকি ও হয়রানির স্বর্গরাজ্য:তদন্তে উঠে এসেছে, সাব-রেজিস্ট্রার মিরাজউদ্দিন ও তার সহযোগীদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে জমির প্রকৃত বিনিময় মূল্য দলিলে কম দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে। বিনিময়ে এই সিন্ডিকেট মোটা অংকের কমিশন হাতিয়ে নিচ্ছে। দাতা-গ্রহীতার কালো টাকা সাদা করার এই নিরাপদ ট্রানজিট পয়েন্টে সাধারণ মানুষ জিম্মি হয়ে পড়েছে। দলিল লেখকরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “আমরা আসলে আলম আর খলিলের কাছে জিম্মি। তাদের নির্ধারিত রেট না দিলে সাব-রেজিস্ট্রার স্যার দলিলে অযৌক্তিক ভুল ধরে আমাদের হয়রানি করেন।”
সিটিজেন চার্টার শুধু দেয়ালেই:অফিসের দেয়ালে সরকারি ফির তালিকা টাঙানো থাকলেও তার কোনো কার্যকারিতা নেই। দলিলের নকল তুলতেও সরকারি ফির বাইরে বাড়তি ২-৩ হাজার টাকা গুনতে হচ্ছে এই চক্রকে। টাকা না দিলে কর্মচারীরা বলতে থাকেন, ‘দলিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না’। অথচ ঘুষের টাকা হাতবদল হলেই মুহূর্তের মধ্যে হাজির হয় কাঙ্ক্ষিত দলিল।
এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে কেরানীগঞ্জ মডেল সাব-রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ মিরাজউদ্দিনের ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। এমনকি তার দপ্তরে সরাসরি সাক্ষাৎ করতে গেলেও তিনি ব্যস্ততার অজুহাতে এড়িয়ে যান। ক্যাশিয়ার খলিল ও মোহরার আলমও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয় জানিয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক তদন্তের মাধ্যমে এই সিন্ডিকেটের শেকড় উপড়ে ফেলা হবে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, কেবল বদলি নয়, বরং এই ‘পার্সেন্টেজ প্যালেস’-এর কারিগরদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
Leave a Reply